ঘুমন্ত এলাকা সাইবেরিয়া

N
nahiyan

আয়তনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় দেশটির নাম হচ্ছে রাশিয়া। এই তথ্যটি প্রায় সবারই জানার কথা। কিন্তু জানেন কি রাশিয়ার সবচেয়ে ভূগোলিক অঞ্চলটির নাম সাইবেরিয়া। ভূবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ মতে মোট স্থলভাগের শতকরা প্রায় ১০ ভাগই এই সাইবেরিয়া এর অন্তর্ভুক্ত এবং আলাদা কোন সার্বভৌম রাষ্ট হলে রাশিয়ার বদলে সাইবেরিয়া হতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ। আর মজার তথ্য হল এই পুরা সাইবেরিয়া অঞ্চলটি এশিয়া মহাদেশের অংশ হলেও এর অধিকারী রাশিয়া রাজনীতিতে ইউরোপীয় দেশ হিসেবে বিবেচিত করা হয়। সেই যাই হোক আজকে এই পোস্ট থেকে সাইবেরিয়া এর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাবেন। জেনে অবাক হবেন এই সাইবেরিয়া অঞ্চলটি প্রকৃতির যেমন তুমুল তাণ্ডব এর শিকার হয়েছে তেমনি মানুষের আবার সুকৃত্তি ও কুকৃত্তি এর সাক্ষী হয়েছে। বিশেষ করে এই পোস্ট থেকে আপনারা জানতে পারবেন কিভাবে সাইবেরিয়া অঞ্চলে সংঘটিত একটা ঘটনার ফলে শতকরা ৯০ ভাগ প্রাণী পৃথিবীর বুক থেকে চিরদিনের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। আসুন নিচের লেখাগুলো থেকে সাইবেরিয়া অঞ্চল সম্পর্কে জেনে আসি। 

 

সাইবেরিয়া এর ভৌগলিক অবস্থানঃ 

সাইবেরিয়া অঞ্চলটি ভৌগলিক ভাবে পশ্চিমে উড়াল পর্বতমালা থেকে পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগর এর উপকুল এলাকা পর্যন্ত বৃস্তিত। আর এর উত্তর - দক্ষিণ এই অঞ্চলটির বৃস্তিতি আর্টিক মহাসাগর থেকে বর্তমান রাশিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া দেশ দুইটির সীমানা পর্যন্ত। সবমিলিয়ে সারবেরিয়ার আয়তন ১ কোটি ২৯ লাখ বর্গকিলোমিটার বা ৫১ লাখ বর্গমাইল। অর্থাৎ রাশিয়া এর মোট স্থলভাগের প্রায় ৮০ ভাগ সাইবেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত। অথচ এই বিশাল এলাকার জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন কোটি। অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে মাত্র ৩ জন বাস করে। এই সাইবেরিয়া নামটির উৎস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্ন মতবাদ রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন এই নামটি এসেছে তাদার ভাষা থেকে। ওই ভাষায় সাইয়েবি এর নামের অর্থ হচ্ছে ঘুমন্ত এলাকা। এই অঞ্চলটি সাদা বরফে ঢাকা দেখে তাদাররা এই অঞ্চলটির নাম দিয়েছেন। আবার কারোর মতে এই নামটি প্রতিবেশী মঙ্গোলীয় ভাষার সু আর বৃ এর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। সেই অনুযায়ী সাইবেরিয়া নামটির অর্থ হবে জলের পাড়ে অবস্থিত বন্যভুমি। সাইবেরিয়া নামের উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এই অঞ্চলটির ভৌগলিক তাৎপর্য নিয়ে বিজ্ঞানীদের মতে কোন দ্বিমত নেই।

 

সাইবেরিয়া সৃষ্টি এর সুচনাঃ 

প্রাগ-ঐতিহাসিক আমল থেকে এই অঞ্চলটি মানবজাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসতেছে। এই অঞ্চল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন জীবাশ্ম ও প্রত্ততান্ত্রিক অনুযায়ী মাত্র ৪০ হাজার বছর আগেও এইখানে কঙ্খপক্ষে তিন প্রজাতির মানুষ বাস করতো। হোমোসেপিয়ান্স ছাড়াও নিয়েন্দান্থাল ও ডেনিথান প্রজাতির এই মানুষদের মধ্যে বাণিজ্য থেকে শুরু করে বংশবিস্তার ও প্রমান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর পাশাপাশি গবেষণা অনুযায়ী আনুমানিক ২৫ হাজার বছর আগে এই সাইবেরিয়া থেকে আদি মানুষ প্রথম আমেরিকা ভূখণ্ডে প্রদাপ্রন করেছিল। ওই সময় পৃথিবীতে চলমান বরফ যুগের কারনে বর্তমান রাশিয়া এবং আলাস্কা মধ্যবর্তী বেরিং প্রজাতির প্রাণী বরফের সেতুতে পরিণত হয়েছিল। শুধু মানুষই না রাতালু বাঘ, গুহাবাসী সিংহ, লোমশ গণ্ডার, মেমো থাতির মতো বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী এই সাইবেরিয়া পথ ধরে আমেরিকাতে পাড়ি জমিয়ে ছিল। পৃথিবীর এই প্রাণী জগতের প্রসারে এমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার বিপরীতে আবার সাইবেরিয়ার কারনে বিপুল পরিমাণ প্রাণী একেবারে বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভূবিজ্ঞানী গবেষণা অনুযায়ী ইতিহাসে ৫০ কোটি এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক অগ্নিপাতের ঘটনা এই সাইবেরিয়াতে সংঘটিত হয়েছিল। আর এই অগ্নুপাত টানা ২০ লাখ বছর পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর ফলে ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা লাভা কঙ্খপক্ষে ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত ঢেকে গিয়েছিল। একই সময় নির্গত হাইড্রোজেন সালফাইড এর মতো বিষাক্ত গ্যাস পৃথিবীর পুরা আকাশ ঢাকা পরে যায়। এই ধারাবাহিকতায় পুরা জীবজগতে উপর মহা বিপর্যয়ে নেমে আসে। বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর ফলে পৃথিবীতে বিদ্যমান জীবজগতের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। জীবজগতের সেই শুন্যতা পূরণ করেছিল বিভিন্ন সরীসৃপ প্রজাতির প্রাণী। যাদের মধ্যে ডাইনোসর এর নামটি অনেকেরই জানা থাকার কথা। সাইবেরিয়াতে এই বিপর্যয় এখানেই শেষ নয়। ১৯০৮ সালে ৩০ শে জুন এইখানে অবস্থিত টাইটান বনাঞ্চলে হঠাৎ আকাশে ধাউধাউ করে জ্বলে উঠে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, মনে হচ্ছিল সূর্যটা যেন মাটির কাছাকাছি নেমে এসে তীব্র গরমে মনে হল আমার শার্টে আগুন ধরে গেছে। আমি শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেলে দিতে চাচ্ছিলাম। তারপর আচমকাই যেন আবার সূর্য যথাস্থানে ফিরে গেল এবং প্রচণ্ড একটা শব্দ শুনতে পেলাম। সেই ঘটনা প্রায় ২ দশক পর ১৯২৭ সালে ঘটনাস্থলের ভিডিও করা হয়েছিল। সেই ভিডিওতে দেখা যায় প্রায় ২ হাজার বর্গমাইল এলাকা বনাঞ্চল আর গাছ উল্কা পিণ্ডের আঘাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী সেদিন সাইবেরিয়াতে প্রায় ২০০ মিটার ব্যাস এর উল্কা পিণ্ড আঘাত হেনেছিল। কিন্তু ভাগ্য ভাল উল্কাপিণ্ডটি পৃথিবীর অনেক উপরে বিস্ফোরিত হয়। যার ফলে পৃথিবীতে এত প্রভাব পরে নি। যদি এইটি পৃথিবীতে আঘাত হানত তাহলে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে এশিয়া মহাদেশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। 

 

সাইবেরিয়া এর বনাঞ্চলঃ

পৃথিবীর বৃহত্তম স্থলভাগ সেই সাথে বৃহত্তম বনাঞ্চল এবং বিশ্বের বৃহত্তম সুপ্রিয় পানি হ্রদ অবস্থিত। সাইবেরিয়ার পুরা উত্তর অঞ্চল জুড়ে বৃস্তিত বিশ্বের বৃহত্তম বনাঞ্চলটির নাম টাইগা। পৃথিবীতে সর্বশেষ বরফ যুগ চলাকালীন এর বৃস্তিত ছিল পুরু উত্তর মেরু জুড়ে। সাইবেরিয়া আর কানাডা পাশাপাশি স্ক্যান্ডেনেভিয়াম দেশগুলো বনাঞ্চল গুলো বরফে ঢাকা ছিল। বিশ্বের মোট স্থলভাগের ১২ ভাগ এলাকা জুড়ে বৃস্তিত। বর্তমান এই বনাঞ্চলটির আয়তন প্রায় ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার বা ৬৬ লাখ বর্গমাইল। এই এলাকাটির বনাঞ্চল প্রায় সময় বরফে ঢাকা থাকে। তাই এইখানে শুধু কনিফার জ���তীয় গাছ বেড়ে উঠতে দেখা যায়। এই জাতীয় গাছগুলো সাধারণত সুই এর মতো নিচে থেকে উপরে সুরু হতে থাকে। এইসব বনাঞ্চলে সারাবছর বরফে ঢাকা থাকলেও এইসব গাছ গুলো সাধারণ তাপমাত্রা থেকে থাকে। যার কারণে গাছগুলো এইসব পরিবেশে আজও টিকে আছে।

 

সাইবেরিয়ার হ্রদঃ 

বৃহত্তম বনাঞ্চল এর পাশাপাশি বৃহত্তম সুপীয় পানির হ্রদ রয়েছে। আর এই হ্রদটির অবস্থান এই সাইবেরিয়া অঞ্চলে। এই হ্রদের নাম হচ্ছে বৈকাল হ্রদ। উত্তর আমেরিকা ৫টি হ্রদের সমন্বয়ে মিলিত আয়তন বৈকাল হ্রদ এর আয়তন এর থেকে কম। আর এইটি হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরাতন হ্রদ। এই হ্রদের সর্বোচ্চ গড় গভীরতা প্রায় ১.৬ কিলোমিটার বা তার বেশি। আর বিশ্বের সবচেয়ে গভীরতম হ্রদ হিসেবে এই বৈকাল হ্রদের নামটি যুক্ত আছে। উত্তর - দক্ষিণে এই হ্রদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬০ কিলোমিটার আর পূর্ব - পশ্চিমে এর প্রস্থ প্রায় ৮৯ কিলোমিটার। অনন্য এই হ্রদটিকে ১৯৯৬ সালে ওয়ার্ল্ড হেরেটিজ হিসেবে এই  হ্রদকে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। 

 

  আজকে এই পর্যন্ত সবাই ভালো থাকবেন , সুস্থ থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমুতুলাহু ওয়া বারারাকাতুহু। 

Comments

jakaria

আসসালামু আলাইকুম ভাই আপনি কেমন আছেন?