ছোটবেলার কথা ও গল্প

M


প্রাচীনকাল থেকেই শিশুরা অতি শৈশবে মা-দাদি-নানি-কাকির কোলে বসে কথা বলার আগেই নদী-পাখি-ব্যাঙ-ফুল-ফল নিয়ে রচিত ছড়া শুনতে শুনতে বড় হয়। ঘুমায়। একদিন তাদের মুখে বোল ফোটে। তারাও ছড়া কাটে। ‘আয় রে আয় টিয়ে/নায়ে ভরা দিয়ে/না’ নিয়ে গেল চিলে...।’ আর তারাও নিজের অজান্তে পরিচিত হয়ে ওঠে আমাদের চারপাশে থাকা পাখিদের সঙ্গে। তাদের খাবারের জন্য যেমন উঠোনে খুদকুঁড়ো ছিটায়, ছড়ায়, তেমনি দাদির সঙ্গে উঠোনের রোদে শুকোতে দেওয়া ধানে চড়ুই, শালিক ও কাক তাড়ায়। শৈশবে মায়ের ডাকের আগে আমাদের ভাই-বোনদের ঘুম ভাঙত পাখির কিচিরমিচির শব্দে, ভিন্ন ভিন্ন পাখির কণ্ঠনিঃসৃত সুমধুর ডাকে। আমরা তাদের কলকাকলি খুব উপভোগ করতাম। তবে দোয়েল সবচেয়ে আগে, কিছুটা অন্ধকার থাকতে জানান দিত রাত পোহানোর। আমাদের মূল বসতঘরের উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি অসাধারণ সুন্দর বড় ডালপালা ঝাপটানো পুরনো আমগাছ ছিল। তার পাশেই ছিল বাঁশঝাড়, জড়াজড়ি করে একটি গাবগাছ, সটান উঠে যাওয়া সুপারিগাছ। অনেক পাখির বাসা ছিল এখানে। দীর্ঘ বছর অসংখ্য পাখি আমগাছের ডালে পাতার ছায়ায় নিয়মিত দিন ও রাত যাপন করত। এটাই ছিল তাদের স্থায়ী আবাসস্থল। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার আশ্রয়স্থল। শীতের সময় পাখির সংখ্যা বেড়ে যেত। জায়গা নিয়ে ঝগড়াও হতো। আমার বেশ মনে আছে, বাঁশঝাড়ের মাথায় চারটি বকও সন্ধ্যার পরে এসে আশ্রয় নিত। চড়ুই আমাদের ঘরেই বাসা করে থাকত টিনের চালের কোনায়। দালানবাড়ির ভেন্টিলেটরে। এখনকার তৈরি বাড়িতে ভেন্টিলেটর থাকে না। চড়ুইও বাসা বাঁধতে পারে না মানুষের ঘরের মধ্যে। সকাল হলেই উঠোনজুড়ে কাক, এক পা, দুই পা করে জোড় শালিকের হাঁটা দেখে মন ভালো হয়ে যেত। টুনটুনিও থাকত বৈকি। ও তো উঠোনের কোণে মায়ের বেগুনক্ষেতের বড় পাতার নিচে বাসা বাঁধত। আমরা বেগুনক্ষেতে বেশি সময় লুকোচুরি খেলতে থাকলে মা সাবধান করে দিতেন, এই টুনটুনির বাসা ভাঙবে না। বহু বছর পরে গত বছর ধানমণ্ডির ৯/এ রোডের নাহার আপার পাঁচতলার ফ্ল্যাটবাড়ির সিঁড়িতে রাখা টবে লাগানো বেগুনগাছের পাতার আড়ালে একসময়ের খ্যাতনামা অভিনেত্রী রিনি রেজা দেখালেন টুনটুনির বাসা। রিনি বলেছিলেন, ‘আসো, দেখো, তোমার ভালো লাগবে।’ সত্যি ভালো লেগেছিল। হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পেলে যেমন আনন্দ হয়, তেমন।

Comments