দইজ্জার কুলে বসত

mahmud50

দইজ্জার কূলে বসত!

-

মানুষটা রিয়াদের শহরতলিতে থাকে। গরীব। পেশাজীবি মানুষ। খেটে খেতে হয়। বউটা পেয়েছে ভাল। আল্লাহভক্ত মেয়ে। বাচ্চা সামলানোর পাশাপাশি নামাজ-কালাম, দোয়াদরূদ নিয়ে থাকেন। স্বামীর কষ্ট কমাতে বাসায় দুয়েকজনকে কুরআন শরীফও পড়ান। বাড়তি দু’চার পয়সা ঘরে আসে।

দুজনেই মোটামুটি শিক্ষিত। বাচ্চাদেরও সৌদি আরব নতুন করে চালু হওয়া আধুনিকতার ছোঁয়া বাঁচিয়ে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রমজান এসে গেল। মানুষটার যতই ব্যস্ততা থাকুক, প্রতিদিন স্ত্রীর সাথে ইফতার করেন। ইফতারি সামনে নিয়ে প্রতিদিন দোয়ার আয়োজন হয়। একদিন একজনের পালা আসে। ঘরের ছোট্ট খুকিটাও সবার দেখাদেখি দোয়া করতে শিখেছে। 

কবিতাপ্রেমী স্ত্রী কিছুটা কল্পনাপ্রবণ। তার দোয়াতেও সেটা ফুটে ওঠে। তার কবিমনে কুরআনে আলোচিত জান্নাতের বর্ণনাগুলো বেশ চমক জাগায়। স্ত্রীর কথাবার্তায় প্রায়ই জান্নাতি প্রাসাদের প্রসঙ্গ উঠে আসে। দোয়াতেও তাই। নিজের দোয়ার পালা এলেই স্ত্রী এই বলে দোয়া শেষ করেন,

ইয়া রাব্ব! আমাদেরকে সামনে নদীঅলা একটি রাজপ্রাসাদ দান করুন। 

মজার বিষয় হল, মায়ের দেখাদেখি শিশুরাও দোয়া করতে শুরু করল। ইয়া রব, আমাদেরকে সামনে নদীঅলা একটি রাজপ্রাসাদ দান করুন। আমীন। 

মা ও শিশুর দোয়া শুনে বাবা শুধু হাসেন। দুষ্টুমি করে বলেন, রাজপ্রাসাদের কথা না হয় চেষ্টাচরিত্র করে মেনে নিলাম। আল্লাহ চাইলে ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু থাকি শুকনো খটখটে মরুভূমির দেশে। এখানে তুমি নদী কোথায় পাবে?  

স্বামীর কথায় স্ত্রী নিজ থেকে কিছু না বলে প্রতিবার শুধু কুরআনের আয়াতখানা পড়েন,

وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدْعُونِىٓ أَسْتَجِبْ لَكُمْ

আর তোমাদের রব বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (সূরা গাফের ৬০)।

আমার যা ইচ্ছা, আমার আল্লাহর কাছে চাইব। আমি যা চাই তিনি আমাকে দেবেনই। তিনি কারীম। মহৎ। কাদীর। সর্বশক্তিমান।

আল্লাহর প্রতি স্ত্রীর সুদৃঢ় একিন দেখে, স্বামীও ভীষণ প্রভাবিত হন। আল্লাহ চাইলে কী না হয়। আল্লাহর কাছে কোনও কিছুই অসম্ভব নেই। আল্লাহ সর্বশক্তিমান। তবে, বাহ্যিক দৃষ্টিতে রিয়াদের বুকে নদীওয়ালা প্রাসাদ শুধু অসম্ভবই নয়, অকল্পনীয়ও বটে। 

স্ত্রীর দোয়া থেমে নেই। নিয়মিত, অনবরত দোয়া করেই যাচ্ছেন। দোয়া করেই যাচ্ছেন। বিরতিহীন, অবিরাম দোয়া চলছে। পুরো রোজার মাস জুড়ে মায়ের দোয়া আর কচি শিশুদের জোরদার আমীন অব্যাহত থাকল। রোজা শেষ হলে স্বামী দুষ্টুমির ছলে বলল,

-কোথায়া প্রাসাদ? কোথায় নদী?

স্ত্রী আগের চেয়েও একিন আর দৃঢ়তার সাথে বললেন,

-ইন শা আল্লাহ, আল্লাহ দেবেনই। তিনি আমাকে বিফল মনোরথ করবেন না।

স্ত্রীর এমন অটল একিন দেখে, স্বামীর মনে হল, এখনই বুঝি আল্লাহর মাটি ফুঁড়ে প্রাসাদ বের করে দেবেন। পরিবারে সবার শাউয়াল মাসে ছয়রোজা শেষ হল। আমাদের মসজিদে ছয়রোজার শেষ দিন ছিল বৃহস্পতিবার। মহল্লার মসজিদে ইফতারির আয়োজন ছিল। এলাকার অত্যন্ত ধনী এক শায়খই সাধারণত ইফতারির ব্যবস্থা করেন। মানুষটা সবসময় মুক্তমনে উপুড়হস্তে অত্যন্ত দামী আর সুস্বাদু ইফতারির আয়োজন করেন। তার দেয়া রাজকীয় ইফতারির কারণেও এলাকার অনেকে প্রতি সপ্তাহে দুটি রোজা রাখে। স্বামী মানুষটা হাড়ভাঙা খাটুনি করে উপার্জন করেন। পাশাপাশি এলাকার উৎসব-আয়োজনে, মসজিদের জমায়েতে, ইফতারির আয়োজনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। 

এসব কারণে উক্ত ধনী শায়খের সাথে মুখচেনা পরিচয় ছিল। কালাম না হলেও নিয়মিত আন্তরিক সালাম বিনিময় ছিল। একধরনের মুমিন-মুমিন পাড়াতো সম্পর্ক। সেদিন ইফতারির দস্তরখানা পরিষ্কার করে নামাজে দাঁড়ানোর আগে শায়খ বললেন, নামাজের পর কথা আছে।

.

সুন্নত ও তাসবীহ শেষ করে শায়খ কাছে ডেকে কোনও ভূমিকা ছাড়াই বললেন, 

-মসজিদের সামনে দেয়াল ঘেরা যে বাড়িটা দেখতে পাচ্ছো, সেটা আমার। আমি মাঝেমধ্যে এখানে থাকলেও, এই বাড়িটা আমার আসলে তেমন কাজে লাগে না। 

আল্লাহ তাআলা আমাকে অনেক দিয়েছেন। ছেলেমেয়েদের দিয়ে থুয়েও আমার থাকার জন্য আরও বাড়ি আছে। তুমি চাইলে এই বাড়িতে উঠতে পারো। কোনও ভাড়া লাগবে না।

এমন কল্পনাতীত প্রস্তাব পেয়ে স্বামী বেচারা বিহ্বল হয়ে পড়ল। তার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে শায়খ বললেন,

-তোমার যদি এমনি এমনি গ্রহণ করতে অস্বস্তি বোধ হয়, তুমি তোমার সামর্থ অনুযায়ী বিনিময় দিয়েও বাড়িটা গ্রহণ করতে পারো। 

স্বামী ঘোরলাগা ভাব নিয়ে ঘরে ফিরলেন। স্ত্রীকে সব খুলে বললেন। শোনার সাথে সাথে স্ত্রী দুই রাকাত শোকরানার নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষ করে নিজের সামান্য কয়েক টুকরা যা অলংকার ছিল, বিক্রির জন্য স্বামীর হাতে তুল দিলেন। এদিক-সেদিক থেকে আরও কিছু টাকা যোগাড়যন্ত্র হল। বিশাল রাজকীয় প্রাসাদের বিনিময়ে এ কটা টাকা কিছুই না। সমুদ্রে এক ফোঁটা পানির ফেলার মতো। শায়খ হাসিমুখে টাকা গ্রহণ করলেন। 

স্বামীর বিস্ময় আর ধরে না। স্ত্রী খুবই স্বাভাবিক। যেন এমনটাই হওয়ার ছিল। ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। নতুন প্রাসাদ উঠে, সব গোছগাছ করার পর, এক বিকেলে ব্যালকনিতে বসে দোলনায় চড়তে চড়তে বিবি বললেন,

-একটা ব্যাপার কি আপনার চোখে পড়েনি? 

-কোন ব্যাপার?

-আমরা দোয়া করেছিলাম, সামনে নদীওলা প্রাসাদ। 

- হাঁ হাঁ, তাইতো। একদম ভুলে গিয়েছিলাম। দোয়ার বাকি অংশের কী হবে? প্রাসাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। এখানে তো সামনে নদী হওয়া অসম্ভব। 

স্বামীর কথা শুনে স্ত্রী মিষ্টি করে হাসলেন। স্বামীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে প্রাসাদের বাইরে ইশারা করলেন। 

-কী দেখা যায়? 

-কেন, মসজিদের মিনার?

-আল্লাহ তাআলা আমাদের পুরো দোয়াই কবুল করেছেন। আল্লাহ তাআলা বান্দাকে অসম্পূর্ণ কিছু দেন না। তিনি চাওয়ার চাইতেও অনেক বেশি দিয়ে দেন। তবে সবসময় বান্দা যেভাবে চায় সেভাবে দেন না। যেভা���ে দিলে বান্দার উপকার হবে, সেভাবে দেন। বান্দা প্রথমে বুঝতে না পারলেও, পরে বুঝতে পারে।

-কিন্তু এখানে নদী কোথায়?

-আসুন দেখাচ্ছি। 

স্বামী দ্বন্দ্বে পড়ে গেলেন। রিয়াদের এমন খটখটে এলাকায় নদী কোত্থেকে আসবে? স্ত্রী বললন,

- আমি যার কাছে হিফজ করছি, কেরাত শিখেছি, তার কাছে ফোন করে আমাদের অবস্থার কথা বিস্তারিত জানিয়েছি। আপনার মতো আমাও নদীর ব্যাপারটাতে খটকা ছিল। দৃঢ় একিনের সাথেই জানতাম, আল্লাহ তাআলা নদীর ব্যবস্থা করবেই। কিন্তু কীভাবে? আপুর কাছ সেই কৌতুহলই প্রকাশ করেছিলাম। তিনি জানতে চেয়েছিলেন,

-তুমি বাড়ির সামনে নদী কামনা করেছিলে আল্লাহর কাছে। এখন তোমার বাড়ির সামনে কী আছে?

-অপূর্ব সুন্দর আর বিশাল এক মসজিদ আছে।

-এটাই তোমার সেই স্বপ্নের নদী। 

আমি ভীষণ অবাক। রীতিমতো আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা। মসজিদ কীভাবে নদী হয়?। আপু বললেন,

-এসো , বুঝিয়ে বলি। তোমাদেরকে পাঁচ নামাজে গুনাহ মাফ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস মুখস্থ করিয়েছিলাম। পাঁচবার গোসল করা নিয়ে, মনে আছে?

-জি, মনে আছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَرَأَيْتُمْ لو أنَّ نَهْرًا ببابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ منه كُلَّ يَومٍ خَمْسَ مَرّاتٍ، هلْ يَبْقى مِن دَرَنِهِ شيءٌ؟ قالوا: لا يَبْقى مِن دَرَنِهِ شيءٌ، قالَ: فَذلكَ مَثَلُ الصَّلَواتِ الخَمْسِ، يَمْحُو اللَّهُ بهِنَّ الخَطايا

বল তো যদি তোমাদের কারো বাড়ির সামনে যদি একটি নদী থাকে, আর সে তাতে প্রত্যহ পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার দেহে কোনও ময়লা থাকবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, তার দেহে কোনোরূপ ময়লা বাকী থাকবে না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের উদাহরণ। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তা‘আলা (বান্দার) গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন (আবূ হুরায়রা রা.। বুখারী ৫২৮)।

.

আপু কোত্থেকে কী মিলিয়ে দিলেন। এমনটা আমি ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করিনি, আল্লাহ তাআলা আমাদের দোয়া এভাবে কবুল করবেন। তিনি বাস্তবের নদীর চেয়েও আরও বেশি ফলদার আর বহুমুখী নদী দিয়েছেন। হাদীসে ভাষ্য অনুযায়ী, মসজিদকে আমরা নদী হিসেবে ধরে নিতে পারি। নদী যেমন শরীর ও সমাজের ময়লা-আবর্জনা ধুয়েমুছে সাফসুতরো করে দেয়। মসজিদও তাই। মসজিদে সলাত আদায়ের মাধ্যমে, আমাদের কলব পরিশোধিত হয়। মসজিদের প্রভাবে সমাজও যাবতীয় অশুচি থেকে মুক্ত থাকে।

.

বিস্ময়ে স্বামীর দুইচোখ ঠিকরে বেরোবার উপক্রম হল। স্ত্রী মিটিমিটি হেসে বললেন,

-নদী থাকলে আমরা বড়জোর গোসল করতে পারতাম। নৌকায় চড়তে পারতাম। বাচ্চারা সাঁতার কাটতে পারত। এখন ঘরের লাগোয়া মসজিদ থাকাতে, আমরা ভাল করে আখেরাতের পথে সাঁতার কাটতে পারব। দৈনিক পাঁচবার করে শুদ্ধতার গোসল করতে পারব। বাচ্চারা নিয়মিত মসজিদে যেতে পারবে। মসজিদের সামনে থাকা বিশাল বাগানে ঘুরে বেড়াতে পারবে। মসজিদে ছোটদের খেলাধূলার জায়গা আছে। বিকেলে খেলতে পারবে। মসজিদে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত হালকা হয়। নারী-পুরুষের আলাদা বন্দোবস্ত আছে, সেখানে বাচ্চাদের নিয়ে আমরা দুজনই অংশ নিতে পারব। সবচেয়ে মজার বিষয় হল, মসজিদ কমপ্লেক্সে সুইমিং পুলও আছে। এর চেয়ে ভাল নদী আর কিছু হতে পারে?

আসলে দোয়ার চেয়ে দুনিয়াতে শক্তিশালী আর কোনও অস্ত্র নেই। দোয়া মুমিনের হাতিয়ার। যুগে যুগে দোয়াই ছিল দুর্বলের প্রধানতম অবলম্বন। 

আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতূবু ইলাইহ।

লা হাওলা ওয়ালা কুউয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

সুবহানাল্লাহি বিহামদিহি ওয়া সুবহানাল্লাহিল আযীম।

 

শায়েখ আতিক উল্লাহ

Comments