আমার মনের কথা।

mahmud50

গল্পটা পড়তে পড়তে আমি এতটাই হারিয়ে গিয়েছিলাম যে চোখের কোনে কখন বিন্দু বিন্দু জল জমেছে টেরই পাইনি.............!!!

 

আজ আমার স্বামী নির্বিঘ্নে দ্বিতীয় বিয়ে করে ঘরে ফিরেছেন। 

তিনি যে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন এখবর আমি তাঁদের(আমার স্বামী এবং তাঁর নতুন বউ) আসার একটু আগেই জানতে পেরেছি। 

আমার স্বামীই আমাকে ফোনে কল করে জানিয়েছেন। 

কিন্তু আমি বিশ্বাস করিনি।

!

সত্যি সত্যি যখন তিনি বউ সমেত ঘরে ফিরলেন তখন আর বিশ্বাস না করে উপায় ছিলনা। অবশ্য তিনি যে আরেকটি বিয়ে করেছেন এর পেছনে তাঁর কোন দোষ ছিলনা, সমস্ত দোষ আমার।

যাহোক বউ বেশ সুন্দরী। 

লাল টুকটুকে ফর্সা। কিন্তু তার পরনে লাল টুকটুকে শাড়ি বিরাজ না করে কালো বোরখায় বেশ ভদ্র নম্র দেখাচ্ছে। আমাদের (আমার স্বামী আর আমার)শোওয়ার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নেকাবটা সরিয়ে কেমন যেন একটু ইতস্তত বোধ করল নতুন বউ। নতুন জায়গা বলে কথা। আমি বারান্দার একপাশে অবস্থিত খাটের উপর বসেছিলাম। আমার স্বামী আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে এসেই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। তাঁর আচরণে আমি মোটেও বিচলিত না হয়ে নতুন বউয়ের দিকে এগিয়ে এসে সালাম দিলাম, তার সাথে কোলাকোলি করলাম। সেও বেশ সহজভাবে সালামের উত্তর দিল। দেখে মনে হলো আমার সমবয়সী। সরলমনা মিষ্টি মেয়ে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার নাম কী বোন?"

"শাহিনা। আপনার? "

"সারিনা।"

"বাহ! আমাদের দু'জনের নামের বেশ মিল আছে তো!"

তার উত্তর শুনে মনে হলো আমরা খুব পরিচিত একে অপরের। আমি খুশি হয়ে বললাম, "হা, ঠিক দুই বোনের মত।"

!

আমার স্বামী এতক্ষণে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, "ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে গল্প না করে ভেতরে নিয়ে বসতে দাও।" বু্ঝলাম তাঁর খাতির যত্ন ফেলে নতুন বউয়ের সাথে আমার এমন ভাব জমানো কথা একদমই তাঁর আতে সয়ছেনা। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, "তাই তো! দেখনা আমি ভুলেই গেছিলাম। চল চল, ঘরে গিয়ে বসবে। আমি কিন্তু তোমার সাথে 'তুমি' করেই বললাম। তুমিও তাই বলো।"

আমার এমন একটা স্বাভাবিক আচরণ যেন বাড়িতে আমার সতীন আসেনি আমার ছোট দেবর বিয়ে করে একটা "জা" এনেছে আমার জন্য। এহেন আচরণে আমার স্বামী বিরক্ত হয়ে নতুন বউয়ের সামনে বুঝিয়ে দিয়ে গেল আমার মূল্য তাঁর কাছে কতখানি। এখনই এমন তাচ্ছিল্য! আমার সতীন বুদ্ধিমতী হলে নিশ্চয়ই বুঝে নিয়েছে এই ঝাঁঝালো কণ্ঠের অন্তর্নিহিত অর্থ কী দাঁড়ায়।

.!

ঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে মিষ্টি আর আপেল এনে শাহিনাকে দিলাম। ও খেতে চায়লোনা কিছু। বললো পেট ভরা। বাইরে থেকে অনেককিছু খেয়ে আসছে। আমি আর জোর করলামনা। বাইরে উনি (আমার না, আমাদের স্বামী সাদিক হোসেন) বসে আছেন যে খাটটাতে কিছু পূর্বে আমি যেখানে বসে ছিলাম। মিষ্টি নিয়ে গেলাম উনার কাছে। উনি গ্রিলের খোপ দিয়ে আকাশের দিকে তাঁকিয়ে হয়তো উথালপাথাল মেঘের উড়নচণ্ডী খেলা দেখতে মনোযোগী ছিলেন। মনোযোগে ছেদ পড়ল আমার জুতার শব্দে। উনি চমকে উঠে ফিরে তাঁকালেন। আমাকে দেখে তাঁর সরল চাহনি নিমিষেই কঠিন হয়ে উঠল। তাঁর দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে এমন কটমট করে আমার দিকে তাঁকালেন যেন এক্ষুণি আমাকে খেয়ে ফেলতে পারলে বেঁচে যান। আমি ভয়ে কাচুমাচু হয়ে অশ্রুসজল চোখে মিষ্টি এগিয়ে ধরে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, "খাবে?"

!

তিনি প্রত্যুত্তর না দিয়ে গটগট করতে করতে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। উনাকে প্রচণ্ড ভালবাসার দরুন আমার এই অশ্রুপাত। এরকম শাসনের চক্ষে তাঁকালেই আমি বুঝতে পারি আমার উপর তিনি প্রচণ্ড রকমের ক্ষেপে আছেন। আমার এ অশ্রু মোটেও উনার দ্বিতীয় বিয়ে করার কারণে উনাকে অপরাধী সাব্যস্ত করার জন্য ছিলনা। কে জানে কী ভাবলেন উনি! চোখের পানি লুকিয়ে দ্রুত ঘরে চলে গেলাম। শাহিনাকে বললাম, "দেখতো তুমি এখনও অরকমই বসে আছো। ফোনটা রাখ বোন এখন। বাড়িতে জানিয়েছ না পৌছে গেছ? বাড়ির সবাই কেমন আছেন?"

"আলহামদুলিল্লাহ্ ভাল। হা জানিয়েছি।"

"তাহলে ওঠো, বোরখা খুলে ফ্রেশ হয়ে নাও। মাগরিবের নামাজ পড়বেনা?"

"হা আপু পড়বো!"

"আপু না, তুমি আমার নাম ধরে ডাকবে।"

"না আপু, তা কি করে হয়! যাই-ই হোক আপনি আমার বড়...।"

"আরে বাবা, তাতে কী! তুমি নাম ধরেই ডেকো।"

"আচ্ছা যাও, সারিনা আপু বলবো। ঠিক আছে?"

আমি ইতস্তত করে যৎসামান্য খুশি হয়ে বললাম, "আচ্ছা, তাই ডেকো।"

!

মাগরিবের নামাজ শেষে আজকে কেমন জানি খুশি খুশি লাগছে। অন্যদিন এই সময়টা একা থাকতে হয়। উনি ঈশার নামায শেষ করে বাসায় ফেরেন। সারাদিন উনার শুধু ব্যস্ততা আমার ভাললাগেনা একা একা। একটা সাথী হয়েছে কথা বলার এটা ভেবেই কেমন একটা তৃপ্তি লাগছে!

রাত ১১ টা বাজে। উনি এখনও ঘরে ফেরেননি। এমন রাত কখনও হয়না উনার। কল করলাম চারবার। ধরলেননা। শেষবারের কলটি কেটে দিলেন। আমি শাহিনাকে বললাম, "চলো আমরা খেয়ে নিই।"

শাহিনা আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে বলল, "উনি..?"

"হা উনি আসবেন। ফোন কেটে দিলেন যেহেতু শিঘ্রই আসবেন।"

!

"আচ্ছা তাহলে চলো আমরা দ্রুত খেয়ে নিই।"

মনেমনে ভাবলাম নতুন বরকে রেখে দ্রুত খেয়ে নিতে চায়ছে কেন! হয়তো খুব ক্ষুধা লাগছে। আমার আরও আগে ওকে খেতে দেওয়া উচিত ছিল।

ফ্রিজ থেকে চিংড়িমাছের ঝোল আর গরুর মাংস বের করে গরম করলাম। শাহিনার প্লেটে তুলে দিলাম পাঁচ-ছয়টি চিংড়িমাছ। ওকে একা কী করে খাওয়াই ভেবে সঙ্গ দিলাম। খাওয়ার মধ্যে একবার উনার কথা মনে পড়ে মন খারাপ হলো। বেচারা আমার হাতে খেতে পছন্দ করে। প্রায় রাতে উনাকে খায়য়ে দিতে হয়। এই আহ্লদী সভাবটা আম্মা(আমার শাশুড়ি) শিখিয়েছেন উনাকে।

খাওয়া শেষ করে শাহিনাকে শুইয়ে দিয়ে উনার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। শাহিনা গল্প করতে করতে ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে।

.!

১২ টা বাজে এখনও খোঁজ নেই তাঁর। কী এমন জরুরি কাজ যে এতরাত পর্যন্ত তাঁর বাইরে থাকা লাগবে। নতুন বউ ঘরে এনে কেউ এভাবে রেখে পালায়। এ কেমন বর! ১২:০৯ বাজে যখন উনি দরজায় নক করলেন। আমি এক ছুটে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। উনি মাথানিচু করে আমাদের ঘর থেকে পাশের ঘরে চলে গেলেন। আমিও উনার পেছন পেছন গেলাম। উনি টুপিটা খুলে ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখলেন। পাঞ্জাবীর বোতাম খুলবে তখন আমি উনার সামনে গিয়ে বোতাম ধরে ছলছল নেত্রে বললাম, "এই কাজটা আমার। প্লিজ আমার এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করিওনা!"

উনি কোন কথা না বলে দাঁতে দাঁত চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি একটা একটা করে পাঞ্জাবীর বোতাম খুললাম। তারপর উনার বুকে আস্তে করে মাথাটা রেখে বললাম, "আমি কিন্তু খুশি!"

উনি আমাকে বাহুডোরে বাঁধলেননা। আমাকে স্পর্শ না করে দুুই পা পেছনে সরে রেগেমেগে বেডের উপর গিয়ে বসলেন। আমি পেছনে ঘুরে উনার কাছে আসলাম, "কথা বলবেনা আমার সাথে? এতরাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে!"

!

"....."

আমি উনার ডান হাতটা তুলে নিয়ে হাতের উল্টোপিঠে অধর ছুঁয়ে বললাম, "চলো খাবে!"

বুঝতে পারলাম উনি ব্যথাতুর হৃদয়ে উত্তর করলেন, "ক্ষিদে নেই!"

যেহেতু আমার হাতে খেতে উনি খুবই পছন্দ করেন তাই উনাকে আরো খানিকটা ব্যথা দিতে আমি বললাম, "আমি খাইয়ে দিই! প্লিজ!"

উনি চুপ করে রইলেন। আমি খাবার এনে উনাকে খাইয়ে দিয়ে নতুন বউয়ের ঘরে ঢুকিয়ে দিলাম।

!

তারপর আমিও এসে শুয়ে পড়লাম। একা একা শুতে ভয় লাগছে তার উপর মশার কামড়। ঘরটিতে একটি দরজা দুটি জানালা। লেপটা মাথা অবধি ঢেকে দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছেনা।

সাদিকের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে ৮ মাস হলো। এই কয়দিনে আমি উনাকে যতটা ভালবেসেছি উনি তার দ্বিগুণ ভাল আমাকে বেসেছে! আমি এই সুযোগটা কখনও হাতছাড়া করিনি। সুযোগ পেলেই অভিমান করি, ভালবাসার ব্যথায় উনাকে ব্যথিত করে তুলি! আজ দুইদিন হলো একটা বিষয়ে উনাকে শক্ত একটি আঘাত করে ফেলেছি। অবশ্য এই আঘাতটি প্রায় প্রায় করি। আমার গায়ের রং শ্যামবর্ণ। তাই বিয়ের আগে আমি ভাবতাম আমার যার সাথে বিয়ে হবে সে যদি কখনও ফর্সা মেয়ে বিয়ে করতে না পারার আফসোস করে তাহলে তাকে আরেকটি বিয়ে করতে বলবো ফর্সা মেয়ে দেখে। কিন্তু আমার স্বামী অখুশি হওয়া দূরে থাক আমাকে পেয়ে দিনদিন উনার সন্তুষ্টির পাল্লা যেন ভারী হতে লাগলো। এতে আমি যারপরনাই ব্যথিত হতে লাগলাম কেননা নিজেকে স্বামীর সামনে উদার এবং স্যাক্রিফাইজিং স্ত্রী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য বিয়ের আগে সবরকম মানসিক প্রস্তুতিই নিয়ে রেখেছিলাম। তাই সেদিন ঘুমানোর সময় উনাকে রাগানোর জন্য বললাম, "তুমি আমাকে পেয়ে তেমন খুশি না বলো। আমিও জানি একটা হাইফাই লেভেলের সুন্দরী মেয়েই তোমার পাশে মানায়। কী খেয়ে যে আমাকে বিয়ে করতে গেলে তুমি!"

!

সাদিক রাগান্বিত হয়ে বললো, "এই বাজে কথাগুলো বলতে তোমাকে না করেছি সারিনা!"

"কিন্তু আমার কেমন জানি লাগে। তুমি আমার স্বামী। আর তোমার কোন আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থাকুক আমি তা চাইবো কখনও বলো?"

"কী চাও কী তুমি শুনি! আরেকটা বিয়ে করি? ওকে তাই হবে!"

উনি অত্যধিক রাগের সহিত কথাগুলো বলে এক ঝটকায় গায়ের লেপ ফেলে দিয়ে ওদিকে ঘুরে শুলেন। আমিও আর কোন কথা বললামনা।

!

উনি সেই যে আমার দিক থেকে পেছন ফিরে ঘুমালেন, সারারাতে আর একটিবারও আমার দিকে ফিরলেননা। আমি উনার সন্নিকটে গিয়ে গায়ে লেপ তুলে দিয়ে আদুরে বিড়ালের মত উনার পিঠ ঘেষে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরে নামাজ পড়তে উঠলাম দু'জনে। উনি মসজিদে গিয়ে আর ফিরলেননা। সকাল গড়িয়ে বিকাল, বিকাল গড়িয়ে রাত তবু কোন খোঁজ নেই। আমার খুব ভয় হচ্ছিল। পুরো বাড়িতে আমি একা তার উপর উনার কোন খোঁজই পাচ্ছিনা। কল দিলে ফোনের সুইচ্ড অফ পাচ্ছি। শুধুু একটা এসেমেস দিছে আমি যেন রাতে একা না ঘুমাই। তারপর দুই দিন বাদে আজকে একেবারে নতুন বউ সাথে করে ফিরলেন। কত আশা ছিল নিজের বরের জন্য নিজে মেয়ে খুঁজবো তাতেও উনি ঘি ঢাললেন।

!

বিয়ের রাতে উনার একটা জিদের কথা আজকে খুব মনে পড়ছে। কী সহজে আমাকে দিয়ে আপনি থেকে তুমি করে কথা বলালেন! ঐরাতে উনি রুমে ঢুকলে আমি সালাম দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, "বসুন।" উনি শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, "জ্বী, আপনিও বসুন।"

আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাঁকিয়ে আছি দেখে বুঝতে পেরে বললেন, "আপনি যেমন আমার সাথে আপনি করে কথা বলছেন, আমারও তো কর্তব্য আপনার সাথে আপনি বলা।"

"কিন্তু...

!"

"কোন কিন্তু নয়। "তুমি" করে কথা বলবা। প্রিয়তমা, তোমার হৃদয়ের খুব কাছে পৌছাতে হলে আমার তোমারও সাহায্য প্রয়োজন। I need your help. So please call me "tumi."

আমি ভ্রু কুচকে ঠোট বাকিয়ে মুচকি হেসে মনে মনে ভাবলাম, "এতো দেখি ডাবল স্ট্যান্ডবাজি! আমিতো মিশুক উনি তার চেয়েও বেশী। সুতরাং উপায় নেই। আমার "আপনি" করে কথা বলার অনিচ্ছাকে যখন উনি এত সহজেই পড়তে পারলেন আমার আপনি বলার অহেতুক ঢং সেখানে বেমানান।" উনাকে পেয়ে আল্লাহর নিকট শুকরান গুজার করলাম।

কিন্তু হ্যাঁ; উনার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা আর অপরিসীম মমতার খাতিরে অন্যদের কাছে উনি, উনার করে কথা বলার স্বভাব অগোচরেই তৈরী হয়ে গেছে আমার।

.!

নতুন বউয়ের সাথে আমার খুব ভাব জমে উঠলো। হাসি-খুশিতে কাটছে দিন ভালোই। কিন্তু প্রতিদিন সকালে উনার ফোলাফোলা লাল চোখদুটো দেখে আমার কান্না পাই। মনে হয় প্রতিরাত জেগে জেগে কাটান উনি। এভাবে চারপাঁচ দিন চলে গেল। আজকে খুব ইচ্ছা করছে উনার পাশে ঘুমাতে। রাতে বাসায় ফিরলে খাওয়াদাওয়া শেষ করে সাদিক যখন ঘুমাতে যাবে ওর বা'হাতটা টেনে ধরলাম। সাদিক দাঁড়িয়ে গেল। বললাম, 

!

"আজকে একটু আমার কাছে ঘুমাবে? খুব ইচ্ছা করছে তোমার পাশে ঘুুমাতে! মনে হয় কতরাত তোমার পাশে ঘুমাইনা!" কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন আমার বুক ফেঁটে কান্না বের হতে চায়লো। সাদিক অগ্নিদৃষ্টিতে আমার দিকে তাঁকিয়ে কোন কথা না বলে হাতটা ছাড়িয়ে চলে গেল। আমি বেডে এসে শুয়ে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম। এভাবে আরো পাঁচটা দিন কেটে গেল। এর মধ্যে সাদিক একটা রাতও আমার পাশে ঘুমায়নি। সারাদিন বাসায় থাকেনা। দুপুরে আজকাল বাইরে খায়। তাঁর সাথে যেটুকু সাক্ষাৎ আমার হয় তাতে কথা হয় কিঞ্চিত পরিমাণ। তবু উনি ভা���মতো কোন কথার উত্তরই দেননা। এই দশদিনে শাহিনার সাথে আমার যতখানি সখ্যতা হয়েছে ঠিক ততখানি দুরত্ব বেড়েছে সাদিকের সাথে।

!

রাতে তেমন ঘুম হয়না আমার। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ার রাত পার করে চলেছি আমি। তবু উনার একটুও মায়া হয়না আমার প্রতি! নতুন বউ পেলে যে উনি আমাকে এরকম পর করে দেবেন আমি বুঝিনি। ১০ দিন পার হয়ে গেলে আমার ধৈর্য বাঁধ সাধলো। ফজরের নামাজ শেষ করে বাপের বাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। বোরখা পরে শাহিনার কাছে গেলাম বিদায় নিতে। ও ঘরের আলনা গোছাচ্ছিল। সাদিক নামাজ পড়তে গিয়ে এখনও ফেরেননি। যাওয়ার সময় অন্ততপক্ষে একবার দেখা হতে পারতো, তাও হলোনা!

আমাকে এত সকালে বোরখা পরিহিত অবস্থায় দেখে বিস্মিত নয়নে শাহিনা এগিয়ে আসলো, "কোথায় যাচ্ছ সারিনা আপু?"

!

"ক'দিনের জন্য বাপের বাড়িতে। শিঘ্রই চলে আসবো ইন-শা-আল্লাহ্। তুমি উনাকে দেখে রেখো। আর নিজের খেয়াল রেখো।"

কিন্তু শাহিনা আমার শেষের কথাগুলোয় তেমন কর্ণপাত না করে দ্রুত ফোন হাতে তুলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি মন খারাপ করে বেরিয়ে আসলাম। কেমন জানি মায়া হচ্ছে এই ঘরটি ছেড়ে চলে যেতে! কিন্তু শাহিনাকে বুঝতে দিলামনা।

.!

রাস্তার চারধার ঘন কুয়াশায় ঘেরা। একলা একা আমি পিচঢালা পথে হেঁটে চলেছি নির্ভেজাল অভিমানভরা হৃদয়ে। শিরশির করে হাওয়া বইছে রাস্তার এপার ওপার। শীতে শরীর মাঝেমাঝে কাঁপুনি দিয়ে উঠছে। কোন জনমানব নেই চারপাশে, নেই কোন রিক্সা। লম্বা লম্বা মেহগনি, কদম গাছগুলো থেকে টুপটাপ শিশিরফোঁটা ঝরেঝরে পড়ছে সাথে আমার আঁখিজল। বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠছে উনাকে ছেড়ে থাকার কথা মনে পড়লে। সত্যিই আমি খুব খারাপ, খুব!

!

 অকারণে শুধু উনাকে কষ্ট দিই। যার ফল আজ নিজেই ভোগ করছি। মাঝরাস্তায় এসে আর আমার পা চলেনা। ইচ্ছে করছে ফিরে যায়। তাওতো উনাকে প্রতিদিন চোখের দেখা দেখতে পাব। আবার মনে হচ্ছে না যাবনা। চলে এসে ফিরে গেলে শাহিনা কী ভাববে। আমার একটা প্রেসটিজ আছেনা! সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হলো কে যেন পেছনে হেঁটে আসছে। আমি দ্রুতবেগে পেছন ফিরে তাঁকালাম কিন্তু কেউ নেই। বুকের মধ্যে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলাম। কান্নায় চোখের পাতা ভিজে গেল। মনে মনে বললাম, "এই ভালবাসো তুমি আমাকে! একটাবার ফিরিয়ে নিতেও এলেনা!"

আমার ভাবনায় জল ঢেলে কে যেন পেছন থেকে হাত টেনে ধরল। ভয়ে চোখ বুজে হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলাম। কি��্তু কিছুতেই পারলামনা।

!

 বু্ঝলাম পুরুষ মানুষ। দ্রুত পেছন ঘুরে তাঁকালাম। আমার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। এযে আমার স্বপ্নের পুরুষ, আমার স্বামী, আমার প্রেমিক! মনে হচ্ছে হাজার বছর পর আজ সে আমার এত কাছে। আমার সমস্ত চাপা অভিমান একসাথে হুমড়ি খেয়ে পড়ে হুহু করে কান্না হয়ে বেরিয়ে আসলো। তাঁকে ছাড়া আমার থাকতে না পারার অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়ে যাবার আগেই নিজেকে সামলে নিয়ে হাত ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। উনাকে দেখে যেন আমার সাহস বেড়ে গেল। হাত ছাড়িয়ে দ্রুতবেগে হাঁটতে উদ্যত হলাম। আমার অভিমান উনি বুঝতে প��রলেন। আমাকে আমার চেয়েও বেশী উনি ছাড়া আর কে জানেন! লম্বা পায়ে আমার সামনে গিয়ে এক ঝটকায় আমাকে উনার বুকের জমিনে ফেলে হাতপ্রাচীরে ঘিরে নিলেন। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় আমার আর নেই। উনার পূর্ণ অধিকার ফলানোর আবির্ভাবে আমার কান্না আরো দ্বিগুণ গতিতে বেড়ে চললো। উনিও যে কাঁদছেন বুঝতে বাকি রইলোনা। এবার আমার রজনীগন্ধার মত শক্ত হৃদয় গলে কাঁশফুলের মত নেতিয়ে পড়লো। উনি ভেজাস্বরে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, "আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে বলো! কেন আমাকে কষ্ট দিতে গিয়ে নিজেও কষ্ট পাও!"

!

আমি কোন কথা বলছিনা শুধু উনার বুকে মুখ গুঁজে সাধ মিটিয়ে কান্না করছি। ১০ দিনের অভিমান, কান্না একসাথে। আমি মুখ তুলে একবার উনার দিকে তাঁকালাম। তাঁকিয়ে থেকে মনে হলো কত জনম যেন এভাবে দেখিনি উনাকে। আর উনারও একই হালত। পেছনে তাঁকিয়ে দেখি শাহিনা বড় বড় পায়ে হেঁটে আসছে। আমি উনাকে ছেড়ে সরে দাঁড়ালাম দুই পা পেছনে। বললাম, "পারব!"

উনি কান্নার মধ্যেও অল্প হেসে বললেন, "কী পারবে? আমাকে ছেড়ে থাকতে? কিন্তু আমি তো পারবোনা ডেয়ার!"

"পারবে। তোমার যে নতুন বউ আছে।"

"নতুন বউ! আমার তো মাত্র একটাই বউ।"

"একটা?"

!

ততক্ষণে শাহিনা কাছে এসে বলল, "কী হলো ভাইজান, ভাবির মান ভাঙছে। উফফ, কি কষ্ট করে যে আপু আপু বলে ডেকে এসেছি এতদিন। জানো সারিনা ভাবি, এই কয়দিন প্রতিটা রাত ভাইজান মসজিদে শুয়ে শুয়ে কাটিয়েছে!"

আমি হতভম্ব হয়ে একবার উনার দিকে আরেকবার শাহিনার দিকে তাঁকাই। সাদিক আমার জিজ্ঞাসু দৃষ্টির আহ্বান বুঝে বলল, "হ্যাঁ সারিনা, ও তোমার ননদ, নট সতীন। ঐদিন খালামনিদের বাড়িতে গিয়েছিলাম আমি। সেদিন ওরাও বেড়াতে আসছিল। খালামনির ননদের মেয়ে ও। ওকে বিয়ে দিতে চায়। আমাকে খালামনি বলছিল, 'একটা পাত্র দেখিসতো বাবা। মেয়েটা পর্দানশীলা, নামাজী, ফর্সাও আছে বেশ। বাবা নেই। ওর মা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে আছে।' তখনই আমার মাথায় আসলো এক দুষ্ট বুদ্ধি।"

!

আমি চোখের পানি মুছে একটু হেসে ফেলে বললাম, "থাক, আপনাকে আর বলতে হবেনা। বাকিটুকু আমি বুঝতে পেরেছি। তাই বলে সারারাত না ঘুমিয়ে মসজিদে কাটাতে?"

"ঘুমাতাম তো। আর তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে বলতাম, 'আল্লাহ্, আমার স্ত্রীর একটু সুমতি দাও।' হাহাহা!"

শাহিনা, "হিহিহি!"

আমি- "হিহিহি! তুমি জানলে কী করে আমি এখন চলে যাচ্ছি সেটা।"

"এই যে আমার বোনটি। ঐতো ফোন দিল আমাকে।"

"তারমানে... "

!

"হুম, তারমানে তাই। এখন চলো বাড়িতে চলো। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে আর ভাললাগছে না।"

তিনজনে হেঁটে চলেছি বাড়ির পথে। পুব গগনে হলুদ সূর্য মিটিমিটি করে হাসছে। আমিওo নিজমনে হাসছি। আমার স্বামী বুঝতে পেরে নিজেও নিঃশব্দে হাসতে হাসতে তাঁর ডান হাতটা দিয়ে আমার বা'হাতটা শক্ত করে ধরে হালকা চাপ দিলেন। আমি "উহ্" করে শব্দ করে উঠলাম। ব্যাপারখানা বুঝতে পেরে আমার পাশ থেকে শাহিনা ফিক করে হেসে উঠল। 

আমি আমার স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম, "শাহিনার জন্য পাত্র পেয়েছ?"

উনি জোরপূর্বক হাসি চেপে বললেন, "হুম।"

এক হুজুর।

Comments