আদর্শ চিকিৎসকের গুণাবলী

D
dalim8563


শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার ব্যাপারে ইসলাম মানুষকে জোর তাকীদ দিয়েছে। অসুস্থ হ’লে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তিনি নিজে অসুস্থ হ’লেও চিকিৎসা গ্রহণ করতেন। আর চিকিৎসার জন্য স্বভাবতই ডাক্তারদের শরণাপন্ন হ’তে হয়। তাই সমাজে ডাক্তারদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

চিকিৎসা যেহেতু অভিজ্ঞ ডাক্তার ছাড়া সম্ভব নয়, তাই প্রত্যেক এলাকায় প্রয়োজন মোতাবেক কিছু লোকের সাধারণ চিকিৎসাবিদ্যা অর্জন করা যরূরী।
সুতরাং সমাজের মেধাবী, আদর্শবান এবং আগ্রহী সন্তানদেরকে এই চিকিংসাবিদ্যায় অনুপ্রাণিত করা উচিত। তবে দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, আমাদের দেশে ভুরি ভুরি ডাক্তারদের ভিড়েও আদর্শ ডাক্তারের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য। অনেক শিক্ষার্থী সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মেডিকেলে পড়াশোনা করলেও পরবর্তীতে আদর্শের পাটাতনে থিতু হ’তে পারে না। প্রতারণা, ধোঁকাবাজি ও লোভ-লালসার উন্মত্ত ঢেউয়ের উপর্যপুরি আঘাত তাদের মানবিকতা ও আদর্শের কিশতিকে টালমাটাল করে দেয়। ফলে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে আদর্শ ও মানবিকতার সীমানা থেকে ছিটকে পড়ে যায় এবং জনজীবনের জন্য কোন উপকারী রসদের যোগান দিতে পারে না। উপরন্তু এই অসাধু ডাক্তারদের অমানবিকতার কাছে মানবজীব যিম্মী হয়ে পড়ে, কখনো তাদের হাতেই নিঃশ্বেষ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যে সকল ডাক্তার লোভ-লালসা ও স্বার্থপরতা উপেক্ষা করে শক্ত হাতে দায়িত্বের হাল ধরে থাকেন, তারাই তাদের ত্যাগ, শ্রম ও সেবা দিয়ে মানবজীবনকে নিরাপদ রাখতে সচেষ্ট থাকেন। সমাজে তারাই আদর্শ ডাক্তার হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তারাই হয়ে উঠেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। সমাজের মানুষ আদর্শ ডাক্তারদের মাধ্যমেই চিকিৎসার মৌলিক অধিকার পেয়ে থাকে। তারা যেমন মানুষের অন্তর খোলা দো‘আ পেয়ে থাকেন, পাশাপাশি আল্লাহর পক্ষ থেকেও অঢেল পুরস্কার লাভে ধন্য হন।


চিকিৎসা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। আদর্শ ডাক্তাররা চিকিৎসার মৌলিক অধিকার পূরণে মানব সমাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং তাদের হাত ধরেই মানবতা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে। নিমেণ আদর্শ ডাক্তারের করণীয় ও গুণাবলী তুলে ধরা হ’ল- 

নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা পসন্দ করেন, বান্দা যখন কোন কাজ করে বা কোন বিষয় শিখে, তা যেন খুব ভালভাবে করে বা শিখে’।[3] এই হাদীছের মর্মার্থ হ’ল- একজন ছাত্র চিকিৎসা পেশা গ্রহণ করতে চাইলে, তার জন্য কর্তব্য হচ্ছে উক্ত পেশায় পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হ’তে চাইলে, উক্ত বিষয়ে সে যেন পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করে। আধা আধা শিখে কোন কাজ শুরু করা খুবই অন্যায়। একটি প্রবাদ বাক্য আছে, ‘অর্ধেক মোল্লা দ্বীনের জন্য হুমকি আর অর্ধেক ডাক্তার জীবনের জন্য হুমকি’। কারণ আমাদের দেশে এমন অনেক ভুয়া ডাক্তার আছে, যারা তাদের নামের পাশে এমন অনেক চটকদার ডিগ্রি উল্লেখ করেন, যেগুলো বাস্তবে নেই এবং দেশের আইনে যেগুলোর ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধ। এটা একদিকে সহজ-সরল রোগীদের বিভ্রান্ত করছে, অন্যদিকে দেশের প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখানো হচ্ছে। আবার অনেকেই বিশেষজ্ঞ না হয়েও ভিজিটিং কার্ড ও সাইন বোর্ডে নিজেকে বিশেষজ্ঞ দাবী করেন। এটাও একটা প্রতারণা ছাড়া কিছুই না। কেউ কেউ ২/৪ মাসের প্রফেশনাল ট্রেনিংকে দিব্যি ডিগ্রি হিসাবে চালিয়ে দিচ্ছেন। কোন অশিক্ষিত লোকের আইন ভঙ্গ ও শিক্ষিত লোকের আইন ভঙ্গ কিন্তু এক নয়। শিক্ষিত মানুষের আইন ভঙ্গ অনেক গুরুতর অপরাধ। তাই ডাক্তারদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হ’ল পূর্ণ দক্ষতা নিয়ে মানুষের সেবা করা।

কারণ চিকিসৎসা শাস্ত্র ও অন্যান্য বিদ্যার মাঝে পার্থক্য হ’ল, এখানে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত। তাই চিকিৎসা শাস্ত্রের কোন অপূর্ণতা নিয়ে মানুষের সেবা করা মানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা। সনদ থাকার কারণে, ভুল চিকিৎসা করে মানুষ মারলে দুনিয়ার আদালতে হয়তো ছাড় পেয়ে যাবে, কিন্তু বিবেকের দংশন ও আখেরাতের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে কখনো মুক্তি পাবে না।

রোগীর প্রতি ডাক্তারের যে দায়িত্ব রয়েছে, এর অন্যতম হচ্ছে রোগীকে সম্মান করা। সম্মান করা মানে রোগীর অভিযোগ ও তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনা। তার রোগ বা তাকে নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কোন কথা না বলা। রোগীর প্রতি কোনরূপ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রদর্শন না করা। অনেক সময় রোগীর জ্ঞানগত যোগ্যতা বা সামাজিক অবস্থান নিচু হওয়ার কারণে অবজ্ঞা করা হয়, তাদেরকে সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং অধিক হক্বদার গরীব রোগীর চেয়ে সামান্য রোগের ধনী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা আদৌ কাম্য নয়।

ডাক্তারের খোশকথা দ্বারা উৎফুল্ল হয়ে অনেক সময় রোগীরা প্রশান্তি অনুভব করে। এটাও তাদের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হয়। তাই একজন আদর্শ চিকিৎসক সর্বদা রোগীকে সম্মান দেখিয়ে হাসি মুখে কথা বলেন। এর মাধ্যমে তার ছওয়াবে পাল্লাও সমৃদ্ধ হয়।

মহিলা রোগীর চিকিৎসা মহিলা ডাক্তার দ্বারা করাই উত্তম। তবে সংশ্লিষ্ট রোগের বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার পাওয়া না গেলে বাধ্যগত অবস্থায় পুরুষ ডাক্তারও চিকিৎসা করতে পারবেন। সেখানে মহিলার কোন অভিভাবক তার সঙ্গে থাকবে। অনুরূপভাবে মহিলা ডাক্তারগণও প্রয়োজনে সতর্কতার সাথে পুরুষ রোগীর চিকিৎসা করতে পারবেন। তবে উভয়েই প্রয়োজনের বেশী দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে না এবং স্পর্শ করবে না।

আর চিকিৎসার প্রয়োজনে কারো সতর ও লজ্জাস্থান খোলার দরকার হ’লে শুধু প্রয়োজনীয় অংশ খোলার অনুমতি আছে, এর বেশী নয়। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের জন্য যরূরী হ’ল দৃষ্টিকে সংযত রাখা ও সর্বাবস্থায় তাকওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

মুসলমানরা রোগে-শোকে এবং হর্ষ-বিষাদে একমাত্র আল্লাহর উপর নির্ভরশীল থাকেন। তাই ডাক্তাররা রোগীকে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল হ’তে অনুপ্রাণিত করবেন যে, তার এই রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে এবং একমাত্র তিনিই এই রোগের আরোগ্য দাতা। ডাক্তাররা রোগ সারানোর কোন ক্ষমতা রাখেন না, তারা শুধু রোগীর চিকিৎসা-সেবা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং আল্লাহর হুকুমে সেই চিকিৎসা কার্যকর হয় অথবা অকার্যকর হয়। তাহ’লে রোগী ডাক্তার ও ঔষধের উপর ভরসা না করে আল্লাহর উপর ভরসা করবে, যা প্রকৃত মুসলিমের জন্য অবশ্য করণীয়।

চিকিৎসা পেশা একটি মহান পেশা। এই পেশায় মানব সেবার যত বেশী সুযোগ পাওয়া যায়, পৃথিবীর অন্য কোন পেশাতে সেটা পাওয়া যায় না। ডাক্তারগণ হ’লেন মানবতার খাদেম। তারা যদি আদর্শবান হন, তাহ’লে তাদের হাত ধরেই সমাজে মানবিকতার ভিত রচিত হবে এবং মনুষ্যত্বের নিশান উচ্চকিত হবে।

Comments

sereybd

আমাদের ডিসকোর্ড চ্যানেলে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হল - - https://discord.gg/P4UFyjaZ