হাল ছাড়বেন না, সফলতা আসবেই।

D
dalim8563


জন্মগ্রহণকালে সবার অবস্থা অভিন্ন থাকে। সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানে তখন সব শিশুই অসহায়। তবে সময়ের পরিক্রমায় তারা আর সমান থাকে না বা থাকতে পারে না। সুবিধাপ্রাপ্ত এবং সুবিধাবঞ্চিত বিশেষণে তাদের মাঝে একটা স্পষ্ট সীমারেখা তৈরি হয়। ক্রমে তারা তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে দেখতে শুরু করে। কেউ জীবনের জটিলতা আর কষ্টগুলোর মর্ম উপলব্ধি করে, কেউ আবার শুধুই আক্রান্ত হয়।
পারিবারিক বা বংশগত বিষয়টা এ দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রাখলেও শিক্ষাদানের বিষয়টা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সব মানুষেরই নিজস্ব কিছু দোষ-গুণ আছে। ভালো খারাপ সবকিছু থেকেই শিক্ষা নেয়ার বিষয়টা আত্তীকরণ করা উচিত। সম্ভবত এ কারণেই লর্ড বায়রন বলেছেন, ‘আমরা মানুষ এবং তার বিভিন্ন সংস্করণ পড়ে জ্ঞান আহরণ করি।

আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্যকে মূল্যায়ন করি তার বিত্ত, শক্তি আর অবস্থান দেখে। অথচ এ মূল্যায়ন তাদের অর্থবিত্তের ভিত্তিতে না করে বিনয় ও মানবিকতার ভিত্তিতে করা উচিত। আবার সব ধরনের প্রশংসাও কিছুটা সাবধানে করা উচিত, যা খুব কম লোকেই করতে পারে। এই কমসংখ্যক মানুষ যাবতীয় প্রশংসাকে সুগন্ধি আতর হিসেবে নিয়ে তার গন্ধ উপভোগ করে; কিন্তু গিলে ফেলে না। আর বাকিরা দুর্ভাগ্যজনকভাবে গন্ধ হিসেবে না নিয়ে বরং সেটাকেই গিলতে থাকে।
অহংকার আর উদ্ধত মনোভাব আমাদের নৈতিকতাকে নষ্ট করে দেয়। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক সীমাবদ্ধতা। সুতরাং ক্ষমতার অধিকারীদের বিচার করা উচিত, সমকক্ষের প্রতি আচরণ দেখে নয়; বরং তাদের থেকে কম শক্তিশালীদের প্রতি তাদের কী আচরণ, তা দেখে।


আমাদের আরও একটা সীমাবদ্ধতা হল, আমরা শুধু সাফল্যই দেখি। অথচ কিছু কিছু সাফল্য বংশ পরম্পরায়ও প্রাপ্ত হয়। সত্যিকার সাফল্য হল, ক্রমাগত ব্যর্থতায় দৃঢ় মনোবল ধরে রাখা। সফলতার পেছনের সেসব ব্যর্থতাগুলো আমরা দেখি না বা ইচ্ছা করেই না দেখার ভান করি। অথচ জীবনের শিক্ষা এখান থেকেই শুরু হয়। অনেক কষ্টে পাওয়া সফলতাগুলো সহজে পাওয়া সফলতার চেয়ে বেশি শিক্ষণীয়। কিন্তু এ ব্যর্থতার গল্পগুলো আমরা শুনতে চাই না। অথচ এগুলোই মূলত দৃঢ় অস্তিত্বের গল্প। এ গল্পগুলো আমাদের জানায়- কীভাবে একজন পিছলে পড়ে, একবার-দু’বার নয়; কয়েকবার পড়েও নিজেকে টেনে তোলে। মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় মাইকেল জর্ডান একবার বলেছিলেন, ‘আমি আমার ক্যারিয়ারে ৯ হাজারেরও বেশি শট মিস করেছি। প্রায় ৩০০ খেলায় হেরেছি। ২৬টি ইভেন্টে জেতার ভার দেয়া হয়েছিল আমাকে, মিস করেছি। জীবনে বারবার ব্যর্থ হয়েছি। আর এ কারণেই আমি আজ সফল।’
এখানে মূল কথাটা খুবই সহজ; তা হল, তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বারংবার। ২৬ বারের চেষ্টায়ও নিজের দলকে বিজয় এনে দিতে পারেননি; কিন্তু খেলা থামাননি। কিংবদন্তি হওয়ার আগে তাকে বারবার ব্যর্থ হতে হয়েছিল। তবে প্রতিবার নিজেকে টেনে তুলতে দ্বিধা করেননি। এ ধারাবাহিকতায় ‘পড়ার পর নিজেকে টেনে তোলা’র ব্যাপারটা তাকে কিংবদন্তির আসনে দীর্ঘসময় ধরে আসীন করে রেখেছে।
‘আরও একবার চেষ্টা করা’-এই মন্ত্রই ভিন্নতা তৈরি করে। খুব কম মানুষই আছে-মার্কিন লেখক স্টিফেন কিংয়ের কথা শোনেননি। তিনি এখন খ্যাতিমানদের একজন। কিং ৩০ বার তার বিখ্যাত বই ‘ক্যারি’র (Carrie) পাণ্ডুলিপি জমা দিয়েছিলেন; ৩০ বারই প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। ৩১তম চেষ্টা না করে তিনি পাণ্ডুলিপিটা ছুড়ে ফেলে দেন। তার স্ত্রী সেটা কুড়িয়ে নিয়ে তাকে আরও একবার চেষ্টা করতে বলেন। বাকিটা ইতিহাস। এটাই সেই ‘আরও একবার’; যা বিপ্লব ঘটিয়েছে।

অ্যানিমেশন প্রোগ্রামার ওয়াল্ট ডিজনির বয়স যখন ২২, তিনি মিসৌরির একটি সংবাদপত্রে কাজ করতেন। সেই পত্রিকার সম্পাদক তাকে বরখাস্ত করেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন ডিজনির সৃজনশীলতার অভাবের কথা। ডিজনি যখন হাল ছেড়ে দেয়ার পথে, সে সময় তার এক বন্ধু কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। এভাবেই তার ওয়াল্ট ডিজনি হয়ে ওঠা।
মোজার্ট, এই বিস্ময়কর ব্যক্তির জীবনেও কম ব্যর্থতা নেই। তিনি পাঁচ বছর বয়স থেকে মিউজিক কম্পোজিশন শুরু করেন। জীবদ্দশায় ৫০০টিরও বেশি মিউজিক্যাল মাস্টারপিস রয়েছে। তার কম্পোজিশনের সহজাত দক্ষতা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তার জীবনেও পতন ছিল। তিনি রাজদরবারের সংগীতজ্ঞের পদ থেকে বিতাড়িত হয়েছেন, আর্চডিউক তার ‘দ্য ম্যারেজ অব ফিগারো’কে ‘গোলমেলে’ আখ্যায়িত করেন। তার শেষ তিনটি কম্পোজিশন ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়। এত কিছুর পরও তিনি হাল ছাড়েননি, হতাশ হননি। তিনি তার কাজ চালিয়ে যান পূর্ণোদ্যমে, আবেগ নিয়ে। আর এ দৃঢ়তাই তাকে ‘মোজার্ট’ বানায়।
নিউটন বলেছিলেন, ‘আমার ক্ষমতাগুলো সাধারণ; শুধু প্রয়োগের ভিন্নতা আমাকে সাফল্য এনে দিয়েছে।’ আইডিয়াটা কিন্তু সহজ। যে কাজের ওপর আপনার আবেগ আর ভালোবাসা জড়িত, সে কাজের ব্যর্থতায় কিছুতেই নিরাশ হবেন না। আপনি জানতেও পারবেন না যে, আর একটিবার চেষ্টা করলেই হয়তো আপনি সফল হয়ে যেতেন। ১ হাজার বার ব্যর্থতার পর এডিসন যদি হাল ছেড়ে দিতেন, আমরা হয়তো অন্ধকারেই থেকে যেতাম। ওই ‘আর একবারের’ চেষ্টাই তাকে সাফল্য এনে দিয়েছিল। ‘জীবনে বেশিরভাগ ব্যর্থতায় হাল ছেড়ে দেয়া মানুষ বুঝতেই পারে না, তারা সাফল্যের কত কাছাকাছি ছিল’-এ কথা যিনি বলেছেন, তার নাম এডিসন।

কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও ওবামা সফলতার সঙ্গে ‘হোয়াইট হাউসে’ ৮ বছর কাটিয়েছেন। তিনি কখনও হাল ছাড়েননি। তিনি সবসময় মনে করতেন, ‘হ্যাঁ, আমরা পারব।’ এটাই জীবনে টিকে থাকার মনোবল। তিনি যদি পারেন, আমিও পারব। প্রয়োজন শুধু আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম, কর্মস্পৃহা আর দৃঢ় মনোভাব। ব্যর্থতা কখনও দুর্বলতা নয়; বরং জয় করার বিষয়।

Comments