" মতভেদ "
আজ আমি আপনাদের সামনে প্রাচীন রাজনৈতিক আলোচনা তুলে ধরবো। প্রাচীরটি বহু পুরোনো ক্বওমী,দেওবন্দী,জামায়াতী প্রাচীর। আমরা সবাই মুসলমান। তাহলে মধ্যখানে দেওয়ালটা কে উঠিয়ে দিয়ে একে অপরের মুখ দেখা হারাম করে দিল ?
সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী(রহ.)-তো এক সময় দেওবন্দী আলিমদের শ্রদ্ধার ও প্রিয় পাত্র ছিলেন। হটাৎ করেই তিনি তাদের কাছে হিরো থেকে হয়ে গেলেন ভিলেন। কিভাবে?সেই চেপে থাকা ইতিহাস জাতীর নিকট স্পষ্ট হওয়া জরুরী। এতে করে হয়তো অনেকেরই সত্যকে জানার জন্য চিন্তার খোরাক জোটাবে।
তিনি আপন গতিতে স্বাধীনভাবে তাঁর কার্য চালিয়ে যেতে লাগলেন। তখন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় জাতীয়তা আন্দোলন তথা অখন্ড ভারতে রামরাজ্য স্হাপনের আন্দোলনে মুসলিম জাতী বিভ্রান্ত পথ হারা হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু মাওলানা মওদূদী এই সর্বনাশা আন্দোলন মেনে নিতে পারেননি।বরং কংগ্রেস থেকে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে মুসলমানদের একটা স্বতন্ত্র আদর্শবাদী দল বা জাতি হিসাবে বসবাস করতে হবে-এ ছিল তার বক্তব্য।
কংগ্রেস তার আপন লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য একজন শ্রেষ্ঠ আলিমকে কাজে লাগালো।তারা ভারতের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র দেওবন্দ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী(রহঃ)-কে দিয়ে 'এক জাতীয়তাবাদ' নামে একটি বই লিখালো।উক্ত বইতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাসকারী হিন্দু,মুসলিম,খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ ও জৈন সবাই একই জাতী। তার এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে উপমহাদেশের আলিম সমাজ প্রতিবাদের ঝড় তুললেন।
এ সময় আল্লামা ইকবাল রোগ শয্যায় শায়িত ছিলেন।তিনি রোগ শয্যায় মাদানী সাহেবের এই বক্তব্যের খবর শুনে অত্যন্ত ব্যথিত ও চঞ্চল হয়ে পড়েন। তিনি এই অন্তিম সময়েও মাওলনা মাদানীর এই বক্তব্যেরএই যুগ সন্ধিক্ষণে মাওলানা মওদূদীও বসে থাকতে পারেন নি। তিনি চিন্তা করলেন,হিন্দু-মুসলিম কখনো এক জাতি ও ভাই হতে পারে না। এটা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ।
কারণ,১০ কোটি মুসলমান ৩০ কোটি হিন্দুর সাথে এক জাতি হিসাবে স্বাধীনতা লাভ করে তাহলে তিনগুণ ভোটের জোরে চিরদিনই রামপন্থীগণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকবে। ফলে মুসলিম জাতী হিন্দুদের ক্রীতদাসে পরিনত হবে। মুসলমানিত্ব বলতে কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হবেনা।
তবৃু্ তখন থেকে এখন পর্যন্ত দেওবন্দ মাদরাসা এবং এই গ্রুপের আলিমগণ কংগ্রেসকর সমর্থন করে আসছেন।এমন কি বেশ কয়েক বছর আগে দেওবন্দ মাদরাসার শতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে একজন অমুসলিম মহিলাকে প্রধান অতিথি হিসাবে আনার পেছনে কংগ্রেসের ষঢ়ডন্ত্র ছাড়া কেন কারণ থাকতে পারে এটা বুঝানো হয়েছে ?
কাজেই দেওবন্দ মাদরাসা এবং এর আলিমগণ কংগ্রেসের পলিসিতে চলেছে এবং এখনো চলছে তা আজ জাতীর কাছে স্পষ্ট। এবমাত্র কংগ্রেস প্রীতির কারণেই সম্ভব, যা আজও মুসলমান জাতী বুঝতে অক্ষম।যারা আল্লাহ ও মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে শেষ নবী হিসাবে মেনে চলে তারা হলো এক জাতি অর্থাৎ মুসলিম। আর যারা এটা বিশ্বাস করেনা তারা হলো অন্য জাতি অর্থাৎ কাফের।
এই বিশ্বাসের ভিত্ততে জাতি গঠিত হয় বিধায় কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে হিন্দু-মুসলিম কখনো এত জাতি হতে পারেনা।মাওলানা মওদূদীর এই যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের দ্বারা মাওলানা মাদানীর বক্তব্য ভুল প্রমাণিত হয় এবং ভারত উপমহাদেশের মুসলমানগণ দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিকে মেনে নিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের পক্ষ নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে
সেদিন মাওলানা মওদূদী (রহ) ক্ষুরধার লিখনির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম এক জাতী'-এই ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের বিরুদ্ধে গর্জে না উঠতেন তাহলে আজ হয়তো ইসলামের ইতিহাস বিকৃত হয়ে যেত এবং পাকিস্তান হত না। আর পাকিস্তান না হলে আজকের বাংলাদেশও হত না।
শায়েখ মওদূদীর এই অবদানের ফলে মাওলানা মাদানীর উচিত ছিল তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।কিন্তু তিনি তা না করে উল্টো মাওলানার প্রতি বিদ্বেষী হয়ে উঠেন। এই বিদ্বেষীর ফলে মাওলানা মাদানী পরবর্তীকালে মওদূদীর উপর আক্রমনাত্নক কথা বলে প্রজ্জ্বলিত ফতুওয়ার গোলাবর্ষণ শুরু করেন।আর এটায় হচ্ছে মাওলানা মওদূদীর বিরোধীতার গোড়ার কথা বা মূল কারণ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফতুওয়াবাজির প্রকৃত ইতিহাস।
আমাদের দেশের অধিকাংশ আলিম মাওলানা মাদানী(রহ.)-এর ছাত্র অথবা তাঁর মুরিদ।অতএব,তারা তাদের পীরের অন্ধ অনুসরণ করেই যাচ্ছেন। এমনকি মাওলানা মওদূদীর বিরুদ্ধে মাওলানা মাদানীর কোন কথাকে যাচাই-বাছাই করাকে তারা গুনাহের কাজ মনে করেন। তাই হুজুরের অন্ধ অনুসরণ করণার্থে তারাও মাওলানা মওদূদী(রহ.) এর বিরুদ্ধে ফতুওয়াবাজির ও বিভিন্ন ভাষায় কটাক্ষ করে তাঁর সমালোচনা করে থাকেন।
সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদূদী(রহ.)যদি হিন্দু,মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, শিখ ও জৈন সবাইকে এক জাতি হিসাবে মেনে নিয়ে দেওবন্দী আলিমদের এই অন্যায় ও অন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে নীরব থাকতেন তবে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান হত না,হত না আজকের বাংলাদেশ। অবিভক্ত ভারতে সমস্ত মুসলমান হিন্দুদের গোলাম হয়ে থাকত। আজও অবিভক্ত ভারতের স্বপ্নে বিভোর ক্বওমী ও দেওবন্দী আলিমগণ। যার নজির দেওবন্দীরা আলিমদের কাশ্মির নিয়ে হঙ্কার,"কাশ্মিরও আমাদের" এবং ক্বওমী আলিমদের ভারতের তাবেদার সরকারের গোলামী করার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠে। জামায়াতের সামনে ক্বওমী ও দেওবন্দী আলিমগণ অবিভক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে যে প্রাচীর দাঁড় করিয়ে দিয়ে সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠেছে সেই প্রাচীর ভেঙ্গে যাবার কোন সম্ভবনা নেই। কেন না,স্বাধীন চিন্তা, স্বাধীন মতামত প্রদান ক্বওমী ও দেওবন্দীতে দন্ডনীয় অপরাধ।


