জারার ভাবনাই ঠিক। পাঁচশ টাকার নোট হাতে দিতেই বুড়ো রিকশাওয়ালা আকাশ থেকে পড়ল, ‘এইডা কী দিলেন?” জারা লজ্জিত গলায় বলল, 'দুঃখিত চাচা! আমার কাছে ভাংতি টাকা নেই। তাড়াহুড়োয় বলতেও ভুলে গেছি। আমি খুবই দুঃখিত! রিকশাওয়ালা ক্ষেপে গিয়ে বলল, “ভাংতি নাই মানি? এইডা কোনো কতা হইল? ভাংতি না লইয়া রিকশায় উঠছেন ক্যান?? ‘বললাম তো, বলতে ভুলে গেছি! একটু দেখেন না আশেপাশে পান কিনা।' ‘আমি ভাংতি আনমু কইত্থেকা? আসমান থেইক্কা? ভাংতি দ্যান।” আশেপাশে এরই মধ্যে ভিড় জমে গেছে। বাঙালি জাতি বড়ই অদ্ভুত! রিকশাওয়ালার সঙ্গে একজন মেয়েমানুষ ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করছে, তাদের কাছে এরচেয়ে মজার দৃশ্য আর নেই। মজার এই দৃশ্যটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। এতগুলো মানুষের মধ্যে কেউ একজন ভাংতি দিয়ে সহযোগিতা করলেই কিন্তু ঝামেলা মিটে যায়। কেউ সেটা করতে চাচ্ছে না। ঝামেলা লেগে থাকুক, দৃশ্যটা আরও উপভোগ্য হোক এ-ই যেন তাদের চাওয়া। জারা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। অসহায় লাগল নিজেকে। এমন পরিস্থিতিতে সে আর কখনো পড়েনি। রিকশাওয়ালা ঝাঁঝালো গলায় বলল, “কিতা অইল, ভাড়া দ্যান না ক্যারে? আয়েরে লইয়া বয়া থাকলে তাইবনি? আমার কি আর কোনো কাম কাইজ নাই?” জারা পাঁচশ টাকার নোট হাতে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। নিজেকে অপমানিত মনে হচ্ছে। সে হতভম্ব দৃষ্টিতে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, 'আপনাদের কারও কাছেই কি ভাংতি নেই?'
পুরো ভিড় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্য জমে গেছে। জমজমাট দৃশ্যের এ পর্যায়ে ভাবলেশহীন থাকতে হয়; ভাংতি দিয়ে সহযোগিতা করতে হয় না। জারা মনে মনে তিনবার পাঠ করল—'ইয়া হাফিজু। ‘কী হয়েছে? এখানে এত ভিড় কেন, দেখি দেখি!' জারা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ভিড় ঠেলে ঢুকে পড়া, পাঞ্জাবিওয়ালা এ ভদ্রলোককে জারা কিছুক্ষণ আগেও দেখেছে। এক অন্ধ বৃদ্ধ রাস্তা পার হতে পারছিল না। ভদ্রলোক নিজের দামি গাড়িটা রাস্তার একপাশে দাঁড় করালেন। গাড়ি থেকে নেমে হাত দেখিয়ে অন্য গাড়িগুলোকে থেমে যেতে অনুরোধ করলেন। এরপর অন্ধ লোকটাকে হাত ধরে রাস্তা পার করিয়ে দিলেন। জারার রিকশাটা তখন একটা গলির মাথায় জ্যামে দাঁড়িয়ে ছিল। জ্যামে বসে থাকা অন্য যাত্রীরাও চমৎকার এ দৃশ্য দেখে ভদ্রলোকের খুব প্রশংসা করছিল। পাঞ্জাবিওয়ালা ভদ্রলোক বললেন, “কী হয়েছে? প্রবলেম কী?' রিকশাওয়ালা বলল, “ভাড়া দেয় না। কয় কি, হের কাছে বলে ভাড়া নাই। কন দেহি, এহন আমি কী করি?' জারা হতবাক হয়ে গেল। করুণ গলায় বলল, “মিথ্যে বলছেন কেন চাচা! আমি কি ভাড়া নেই এ কথাটা একবারও বলেছি? শুধু বলেছি আমার কাছে ভাংতি নেই। ভদ্রলোক বললেন, “চাচা, রাস্তা-ঘাটে এম্নিতেও মহিলাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা ঠিক না। তার ওপর, দেখছিনই তো উনি একজন পর্দানশীন মহিলা। উনি না হয়।
একটা ভুল করেই ফেলেছেন। ভাংতি নিয়ে রিকশায় উঠেননি। তাই বলে এই রকম করতে হবে? যান, এখনই টাকাটা ভাংতি এনে দিন। যান।" রিকশাওয়ালা একচুলও নড়ল না। গোঁ ধরে বসে রইল। রিকশা ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। তার হাবভাবে বোঝা গেল, ভাংতি আনা রিকশাওয়ালাদের কন্ম না। এইটা যাত্রীদেরই কাজ। এই কাজে রিকশাওয়ালাদের বাধ্য করতে চাওয়া মহা অন্যায়। জারা বিপদে পড়ে গেল। সে এখানে এসেছে একটা জরুরি কাজে। সময় চলে যাচ্ছে। দেরি করলে ঝামেলা হয়ে যাবে। কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না। সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। কী একটা অবস্থা হলো? কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। কপাল চাপড়ে নিজেকেই নিজে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘বাসা থেকে বের হওয়ার সময় ভাংতি নিয়ে বের হওয়া গেল না? এখন বোঝো মজা!' ভিড় এরই মধ্যে কমতে শুরু করেছে। জমজমাট দৃশ্যের যবনিকাপাত ঘটতে দেখে সম্মানিত দর্শকসমাজ বোধ করি হতাশ। পাঞ্জাবিওয়ালা ভদ্রলোক বললেন, “ভাড়াটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। কত?' রিকশাওয়ালা বলল, ‘বিশ টাকা।' জারা আঁতকে উঠল, “সে কী! আপনি কেন ভাড়া দিতে যাবেন? আমিই বরং চেষ্টা করে দেখি। কোথাও না কোথাও ভাংতি পেয়ে যাব হয়তো।” ভদ্রলোক কোনো কথা শুনলেন না। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে বিশ টাকার একটা চকচকে নোট রিকশাওয়ালার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে যেভাবে এসেছিলেন সেভাবেই গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেলেন। জারা আর দেরি করল না। দ্রুতপায়ে গলির ভেতরে ঢুকে গেল। এখানে একটা কফিশপ আছে। গলির একটু ভেতরে গিয়ে দোতলায়। কোলাহলমুক্ত এবং নিরিবিলি। নিরিবিলি পরিবেশের চিন্তা মাথায় রেখেই হয়তো মেইনরোডে না হয়ে গলির ভেতর কফিশপটি তৈরি করা হয়েছে।
জারার জরুরি কাজটা এই কফিশপেই। এখানে এর আগেও একবার আসা হয়েছিল। সিনথিয়ার সঙ্গে। সিনথিয়া জারার ছোটবোন। অস্থিরচিত্ত স্বভাবের। জারার ঠিক উল্টো। দেখলে মনে হবে দু'জন দুই মেরু থেকে এসে এক পরিবারে বাস করছে। জারা তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেল। ভেতরে ঢুকেই একেবারে পেছনের দিকের একটা টেবিল বেছে নিল। কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে অদূরে থাকা পর্দার দিকে তাকাল। তাকিয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অনুষ্ঠানটি এখনো শুরু হয়নি। টিভিতে এখন এ্যাড চলছে। ঠিক সময়েই আসা হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে জারার রিকশাভাড়া দিয়ে দেওয়া ভদ্রলোকটির জন্যই। নয়তো টাকা ভাংতি করার জন্য কতক্ষণ "দেরি করতে হতো কে জানে! জারার এই প্রথম মনে হলো, একটা ভুল হয়ে গেছে। ভদ্রলোককে ভদ্রতা করে হলেও একটা ধন্যবাদ দেওয়া দরকার ছিল। অথবা, তাকেই বলা দরকার ছিল, ‘আপনার কাছে কি ভাংতি হবে? তাহলে বিশটাকা রেখে আমাকে বাকি চারশত আশি টাকা ফেরত দিন।' তাড়াহুড়োয় কিছুই মনে ছিল না। তা ছাড়া, লোকটাই বা সে সুযোগ দিল কোথায়। গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেল। জারা মনে মনে বলল, 'হে আল্লাহ, আপনি লোকটাকে উত্তম প্রতিদান দিন।'

